,

বিলুপ্ত মাছের কাতারে চলে যাচ্ছে সুস্বাদু কটকটি মাছ

এম. লুৎফর রহমান, নরসিংদী প্রতিনিধি : বহুকাল ধরে শহুরে ইট-পাথরের সভ্যতায় ধূসর হতে থাকা পুরোনো স্মৃতিগুলো কারও কারও মনে নতুন করে সজীব হয়। তাঁদের স্মৃতিতে বারবার ফিরে আসে ফেলে আসা গ্রামীণ শৈশব। সবুজ শৈশব তাঁদের হাতছানি দিয়ে ডাকে। সে ডাকে সাড়া দিয়ে কেউ কেউ জাল, সেচযন্ত্র ও খলুই হাতে নেমে পড়েন পানিতে। কিশোর-কিশোরীদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাঁরাও মেতে ওঠেন মাছ শিকারে। এক সময় গরিবের গোশত হিসাবে পরিচিত ছিল কটকটি মাছ। এ ব্যাপারে কয়েকজন প্রবীণ জেলের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কটকটি মাছ মূলত কাদাপানির মাছ। মাছটি জলাশয়ে পানির নিচে কাদার ওপরে বাস করে। কাদা খায় এবং পানির উপরিভাগের মরা মাছ পচে কাদায় পড়লে কটকটি মাছ সেগুলো খেয়ে জীবনধারণ করে। সাম্প্রতিক সময়ে নদীর পানি ও কাদা দূষণের ফলে এই কটকটি মাছের আবাসস্থল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। যার ফলে এই কটকটি মাছের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে।নরসিংদীর ৪৫ কিলোমিটার মেঘনা ও আশপাশের এলাকার জলাশয়গুলোতে এই মাছ এখন দেখাই যায় না। নরসিংদী অঞ্চলের মানুষ আগে থেকেই মেঘনার স্বচ্ছ পানিতে ধরা পড়া এই কটকটি মাছ রসনা তৃপ্ত করে খেত। আজকাল হাট-বাজারে এই মাছটি খুব একটা দেখা যায় না। যদিও বা কোনো বাজারে আমদানি হয় তাও দাম অত্যন্ত চড়া। বিক্রেতারা এই মাছের দাম হাঁকেন ৬০০ টাকা কেজি। যারা খেয়ে অভ্যস্ত তারা চড়া দাম দিয়েই কিনে নেন। এখন এই কটকটি মাছ পরিণত হয়েছে ধনী মানুষের খাবারে। কটকটি মাছ বাজারে আমদানি হলে ধনীদের চড়া দাম দিয়ে কিনে নিতে দেখলে গরিব মানুষরা শুধুই এখন আফসোস করে থাকেন। দেশের প্রাকৃতিক মাছের মধ্যে এটি একটি ফেলনা মাছ হিসেবে পরিচিত। এলাকা ভেদে কেউ বলে ‘চেকভেগা’, আবার কেউ বলে ‘বেঙ মাছ’। জীবিত অবস্থায় ধরার পর মাছটি কটকট করে আওয়াজ করে বলে এর নাম রাখা হয় কটকটি। মাছটি দেখতে ধূসর কালচে, মুখ বড়, পিঠে নৌকার মাস্তুলের মতো একটি বড় কাঁটা ও চ্যাপটা আকৃতির বলে অনেকে এর নাম দিয়েছে চেকভেগা। তৃতীয় নাম বেঙ মাছ রাখা হয়েছে দেখতে অনেকটা বেংগাচি আকৃতির বলে। মাছটি খেতে খুবই সুস্বাদু। কিন্তু এক সময় এই মাছ কেউ খেত না। নদী, নালা, হাওর-বাঁওড়সহ বিভিন্ন জলাশয়ে এ মাছ প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত। দেখতে বেংগাচির মতো বলে অনেকে বেঙ মাছ বলে এই মাছকে অবজ্ঞা করত। ময়মনসিংহ অঞ্চলের হাওরগুলোতে এ মাছ এত বেশি পরিমাণে পাওয়া যেত যে কৃষকরা জমি চাষ করতে গেলে এ কটকটি মাছের পিঠের শক্ত মোটা কাঁটা পায়ে ফুটে মারাত্মক যখম হত। যার ফলে জমির স্বল্প পানিতে আটকে পড়া এসব মাছ জমি থেকে ঠেলা জাল দিয়ে ধরে জমির আইলের ওপর ফেলে রাখত কৃষকরা। সেখান থেকে স্থানীয় গরিব লোকেরা সিলবারের ডেকচিতে ভরে ট্রেনে করে নিয়ে যেত টঙ্গীসহ রাজধানীর আশপাশের বস্তি এলাকাগুলোতে। এসব বিক্রেতার কাছ থেকে কটকটি মাছ খুব স্বল্প দামে কিনে নিত সাধারণ মানুষ ও এক শ্রেণির ঝুপড়ি হোটেল মালিকরা। তারা মাছটি চামড়া ছিলিয়ে ছোট ছোট করে কেটে কবুতরের গোশতের মসলা দিয়ে রান্না করত। যে খেত সেই এ মাছের ভক্ত হয়ে যেত। এখন বাজারে যা কিছু আমদানি হয় তা ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, সিলেট এলাকার হাওর এলাকা থেকে আসা। অর্থাৎ এই মাছটি ক্রমান্বয়ে বিলুপ্ত মাছের কাতারে চলে যাচ্ছে। মাছটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য নরসিংদীর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা হারুনুর রশিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, এ মাছ সর্ম্পকে বিস্তারিত কোনো তথ্য তার জানা নেই। মৎস্য বিভাগের খাতায় এই মাছটির নাম আছে কিনা তাও তিনি স্পষ্ট করে বলতে পারেননি। তবে সরকারি মৎস্য বিভাগের যেসব বইতে এই মাছের ছবি ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ থাকার কথা সে বইতে তা নেই। তবে তিনি বলেছেন, এই কটকটি মাছ বাংলাদেশের প্রায় সব নিম্ন এলাকাতেই দেখা যায়। এ থেকে ধারণা করা যায়, মাছটির আদি নিবাস সমুদ্র। কোনো কোনো প্রামাণ্য চিত্রে সমুদ্রের তলদেশে এই কটকটি মাছের আকৃতির মাছ দেখতে পাওয়া যায়। সরকারের মৎস্য বিভাগ এই মাছটিকে চাষাবাদের আওতায় না আনলে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের মিঠাপানি থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে কটকটি মাছ।

Print Friendly, PDF & Email

© ARTEEBEE Inc. 2016 ‐ 2018 Version: 20180213t091722

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *