রবিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৮:৩৪ পূর্বাহ্ন



চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমরা কি প্রস্তুত?

চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমরা কি প্রস্তুত?



জাতিসংঘের বিবেচনায় বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে অন্তর্ভুক্তির প্রথম ধাপ সন্তোষজনকভাবে শেষ করেছে।

২০২১ সালে অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী পর্যালোচনায় বাংলাদেশ যদি তার অবস্থান ঠিক রাখতে পারে তাহলে ২০২৪ সালে আমরা চূড়ান্তভাবে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উত্তীর্ণ হতে পারব।

বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এটাই সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়। বাংলাদেশ অচিরেই স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হতে যাচ্ছে, এটি অবশ্যই একটি আনন্দের ব্যাপার বটে। আমরা এ অর্জনের জন্য অনেকদিন ধরেই অপেক্ষা করছিলাম।

আমাদের সেই অপেক্ষার সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে। আমরা আগামীতে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে যাচ্ছি, এটি যেমন আনন্দের সংবাদ তেমনি এ অর্জন ধরে রাখার ব্যাপারে বেশকিছু কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে।

সেই চ্যালেঞ্জগুলো সঠিকভাবে মোকাবেলা করার ওপরই নির্ভর করবে আমরা উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে টিকে থাকব নাকি আবারও স্বল্পোন্নত দেশের কাতারে চলে আসবে।

স্বল্পোন্নত দেশের ধারণাটি প্রথম চালু হয় ১৯৬০ সালে। তবে জাতিসংঘের উদ্যোগে স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসির পৃথক তালিকা প্রণীত হয় ১৯৭০ সালে।

মাথাপিছু জাতীয় আয় কম, অনুন্নত মানবসম্পদ এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতার ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে এমন দেশগুলোকে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। বর্তমানে বিশ্বে ৪৭টি দেশ রয়েছে যারা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় স্থান পেয়েছে। এ তালিকা প্রণীত হয় ১৯৭৬ সালে।

স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা প্রণীত হওয়ার পর থেকে এ দীর্ঘ পথপরিক্রমায় মাত্র ৫টি দেশ এ তালিকা থেকে উত্তরণ ঘটাতে সমর্থ হয়েছে। এগুলো হচ্ছে মালদ্বীপ, বাতসোয়ানা, কেপ ভারদে, সামোয়া এবং ইকুয়েটরিয়াল গিনি।

জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিলের (ইকোসক) উন্নয়ন নীতিমালাবিষয়ক কমিটি সিডিপি তিনটি বিশেষ সূচকের ওপর ভিত্তি করে প্রতি তিন বছর অন্তর স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি বিবেচনা করে।

এ সূচকগুলো হচ্ছে, (ক) বিশ্বব্যাংকের এটলাস পদ্ধতি অনুসরণপূর্বক প্রণীত মাথাপিছু গড় জাতীয় আয়, (খ) পুষ্টি, স্বাস্থ্য, শিশুমৃত্যু হার, স্কুলে ভর্তি ও শিক্ষার হার বিবেচনায় নিয়ে প্রণীত মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং (গ) অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক, যার মধ্যে রয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলার সক্ষমতা, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক অভিঘাত মোকাবেলার সক্ষমতা, কৃষি খাতের অবদান এবং উপকূলীয় অঞ্চলের দুর্দশাগ্রস্ত জনসংখ্যার হার ইত্যাদি।

এ তিনটি সূচক বা শর্তের যে কোনো দুটি পূরণ করতে পারলেই একটি দেশকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য সুপারিশ করা হয়। বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই তিনটি শর্তই পূরণ করেছে।

এ বছর উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য মাথাপিছু গড় জাতীয় আয়ের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ২৩০ মার্কিন ডলার।

বিশ্বব্যাংকের এটলাস পদ্ধতিতে বাংলাদেশের জনগণের মাথাপিছু গড় জাতীয় আয় বর্তমানে এর চেয়ে অনেক বেশি। মানবসম্পদ উন্নয়নে একটি দেশের স্কোর থাকতে হবে ৬৬ বা তারও বেশি। বর্তমানে বাংলাদেশের স্কোর এ ক্ষেত্রে ৭২ দশমিক ৯।

অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে স্কোর থাকতে হবে ৩২ বা তারও কম। বাংলাদেশের স্কোর হচ্ছে এ ক্ষেত্রে ২৪ দশমিক ৮। ২০২১ সালে মধ্যবর্তী পর্যালোচনা অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে বাংলাদেশ যদি তার অবস্থান ধরে রাখতে পারে তাহলে ২০২৪ সালে বাংলাদেশকে চূড়ান্তভাবে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের মর্যাদা এবং অবস্থান আগের তুলনায় বৃদ্ধি এবং সুসংহত হবে।

একটি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট দেশের প্রতিটি মানুষেরই আরাধ্য বিষয়। উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ নিয়ে অবহেলামূলক কিছু বলতে পারবে না। তবে এ অর্জন রক্ষা করার জন্য আমাদের ভবিষ্যতে বেশকিছু কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলাা করতে হবে।

বিশেষ করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এ চ্যালেঞ্জগুলো খুবই কঠিন হতে পারে। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করলে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কোনো দেশ যখন অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এ ধরনের সাফল্য অর্জন করে তখন স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেয়া হয়, সেই দেশটি অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়েছে। তার সামর্থ্য বেড়েছে। তার প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হয়েছে।

তার গ্রহণ ক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বেড়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অন্য যেসব উন্নয়নশীল দেশ রয়েছে তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারবে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দেশটির মর্যাদা আগের তুলনায় অনেকটাই বৃদ্ধি পাবে।

মনে করা হবে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে দেশটি যে কিছু বাড়তি সুবিধা পেত তা আর দরকার হবে না। এ হচ্ছে সাধারণভাবে একটি উন্নয়নশীল দেশ সম্পর্কে আন্তর্জাতিক মহলের ধারণা। এ ধরনের ধারণার যথেষ্ট যুক্তিও আছে। বাংলাদেশ জিডিপি বৃদ্ধি এবং মাথাপিছু গড় জাতীয় আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি এর সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য শর্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

কিসের মাধ্যমে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পেল তা স্পষ্ট নয়। এটি কী উৎপাদনশীল খাতের মাধ্যমে বৃদ্ধি পেয়েছে নাকি অনুৎপাদনশীল খাতের মাধ্যমে এ প্রবৃদ্ধিটা সংঘটিত হয়েছে সেটা পরিষ্কার হওয়া দরকার। জিডিপি প্রবৃদ্ধি কি দেশে বিত্তহীন এবং বিত্তবানের মাঝে বিদ্যমান অর্থনৈতিক আয়-বৈষম্য হ্রাস করতে পেরেছে? অর্জিত প্রবৃদ্ধি কি বিদ্যমান প্রকট বেকার সমস্যা হ্রাসে যথাযথ ভূমিকা রাখতে পেরেছে? এগুলো বিবেচ্য বিষয় বটে।

শুধু প্রবৃদ্ধি বাড়লেই হবে না, সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষ ন্যায্যতার ভিত্তিতে ভোগ করতে পারছে কিনা সেটিও বিবেচ্য বটে। একইসঙ্গে যে পদ্ধতিতে জিডিপি ক্যালকুলেট করা হচ্ছে তা সঠিক কিনা, এতে জিডিপির গুণগতমান রক্ষিত হয়েছে কিনা সেটাও ভেবে দেখতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিকাশ জিডিপি বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিতভাবে অগ্রসর হয়নি।

অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই সঠিকভাবে কাজ করছে না। বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের প্রাথমিক শর্ত পূরণ করেছে এটি অত্যন্ত আনন্দের সংবাদ। কিন্তু এ অর্জনের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ যে কিছু বিশেষ সুবিধা পেত তা হারাবে। যেমন- বাংলাদেশ স্বল্প সুদে আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বিভিন্ন দেশ থেকে ঋণ পেত।

নির্দিষ্ট সময় পর সেই সুবিধা আর বহাল থাকবে না। বাংলাদেশ ইতিপূর্বে আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছ থেকে যে ঋণ পেয়েছে তা কতটা কাজে লেগেছে সেটা অবশ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আগে বাংলাদেশ যে ঋণ পেত আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছ থেকে আগামীতে সেই ঋণ নিতে হলেই বাংলাদেশকে বেশি সুদ প্রদান করতে হবে।

স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বিভিন্ন সুবিধাপ্রাপ্তির ফলে বাংলাদেশের অনেক পণ্যের ‘কস্ট অব প্রোডাকশন’ ছিল তুলনামূলকভাবে কম। এখন সেটি বেড়ে যাবে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সেই পণ্যের প্রতিযোগিতার ক্ষমতা কমে যাবে। প্রতিযোগিতার ক্ষমতা কমে গেলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে তা পুষিয়ে নেয়া যায়।

কিন্তু আমাদের তো উৎপাদনশীলতা বাড়ছে না। কাজেই এ ক্ষেত্রে আমাদের সমস্যায় পড়তে হবে। কাজেই এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হবে। সবচেয়ে বড় অসুবিধা হচ্ছে বিভিন্ন দেশের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার নিয়ে।

বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত জিএসপি সুবিধা পেয়ে থাকে। আরও কিছু দেশ থেকে বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত পণ্য রফতানি সুবিধা পেয়ে থাকে। ইন্টেলেকচ্যুয়াল প্রপার্টি রাইটের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কিছু ছাড় পেত।

এগুলো আগামীতে নির্দিষ্ট সময় পর আর বহাল থাকবে না। একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান তাদের গবেষণায় দেখিয়েছে, উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত হওয়ার ফলে বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা হারালে রফতানি বাণিজ্যে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে ২ দশমিক ৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা কর্তৃক নির্ধারিত বাণিজ্য সুবিধা প্রত্যাহত হওয়ার ফলে বাংলাদেশকে রফতানিকালে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের অতিরিক্ত ৬ দশমিক ৭ শতাংশ শুল্ক পরিশোধ করতে হবে।

আঙ্কটাড বলেছে, এর ফলে বাংলাদেশের পণ্য রফতানি ৫ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ কমে যেতে পারে। বিদেশে শিক্ষা বৃত্তি কমে যেতে পারে।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আইনে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এতদিন যেসব সুবিধা পেয়ে আসছিল তা-ও আর থাকবে না।

উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার আগে অর্থনৈতিক ক্ষেত্র, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে টিকে থাকার জন্য যে ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা দরকার ছিল তা করা হয়নি। কাজেই এ অর্জন আমাদের কঠিন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে।

বাংলাদেশ সরকার জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে যতটা সরব তার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে যে প্রস্তুতি গ্রহণ আবশ্যক ছিল তা তেমন হয়নি।

এ ভারসাম্য হীনতা তার ধাক্কা সামলানো কঠিন হবে বলে অনেকেই মনে করছেন।

যদিও বাণিজ্যমন্ত্রী প্রসঙ্গক্রমে বলেছেন, বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলে যেসব চ্যালেঞ্জ আসবে তা মোকাবেলায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তিনি আরও বলেছেন, জিএসপি সুবিধা বাতিল হলেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন আগামীতে জিএসপি+ নামে একটি নতুন বাণিজ্য সুবিধা প্রদান করবে। কিন্তু জিএসপি+ সুবিধা পেতে হলে আমাদের কী কী শর্ত পূরণ করতে হবে এবং সেগুলো পূরণে আমরা কতটা প্রস্তুত সে ব্যাপারে কিছু বলা হয়নি।

বাংলাদেশ ২০২৪ সালের মধ্যে চূড়ান্তভাবে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলেও বর্তমানে যেসব বাণিজ্য সুবিধা পাচ্ছে তা ২০২৭ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।

এ সময়ের মধ্যে আমাদের নিজেদের উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, যে কোনো নতুন কিছু পেতে গেলে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতেই হয়। আমাদের এখনই ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রস্তুতি নিতে হবে।

এমএ খালেক : অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক

সূত্র: যুগান্তর

খবরটি শেয়ার করুন..








© All rights reserved 2018 somoyersangbad24.com
Desing & Developed BY W3Space.net