শনিবার, ২১ Jul ২০১৮, ১০:০৪ পূর্বাহ্ন




‘নো খালেদা নো ইলেকশন’

‘নো খালেদা নো ইলেকশন’




ড. আবদুল লতিফ মাসুম : নির্বাচন নিয়ে চরম অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষমতার যোগ বিয়োগ কষছে আওয়ামী লীগ। অপর দিকে আদৌ নির্বাচন হবে কি না, অথবা খালেদা জিয়াকে বাদ দিয়ে নির্বাচন হবে কি না, সেই দোলাচলে আছে বিএনপি। দেশে এবং বিদেশে নানা ধরনের মেরুকরণের খবর আসছে। বিএনপির স্ট্যান্ড ‘নো খালেদা নো ইলেকশন’। অর্থাৎ খালেদা জিয়াকে নির্বাচনের বাইরে রেখে জাতীয় নির্বাচন করতে দেয়া হবে না। এর কারণ, নিশ্চিত একটি বিজয়কে নস্যাৎ করতে দেয়া যায় না। ইতোমধ্যেই জন রব উঠেছে বিএনপি ক্ষমতায় যাচ্ছে।

খোদ আওয়ামী লীগের নেতানেত্রীরা আড়ালে আবডালে এসব কথা বলছেন। সত্যি সত্যি যদি একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয় তাহলে বিএনপির বিজয় কেউ ঠেকাতে পারবে না। আরো একটু খোলাসা করে এভাবে বলা যায়, মানুষকে যদি ভোট দিতে দেয়া হয় তাহলে কোনোক্রমেই কোনোভাবেই আওয়ামী লীগের বিজয়ের সম্ভাবনা নেই। একজন রিকশাওয়ালা, উত্তরবঙ্গে তার বাড়ি। তার ধারণা মানুষ ভেতরে ভেতরে গুমরে মরছে। একটু সুযোগ পেলেই তাদের রাগ ক্ষোভ ও ক্রোধের বিস্ফোরণ ঘটবে। তার ভাষায় যদি এটুকু নিশ্চিত করা যায় যে, পুলিশ গুলি করবে না তাহলে দেখবেন মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে আসবে। সে পলিটিক্স বোঝে না; কিন্তু এটা বুঝে, শুধু র্যাব পুলিশ এতদিন তাদের টিকিয়ে রেখেছে। এটা যদি সাধারণ মানুষের বক্তব্য হয়, তাহলে আওয়ামী লীগের জন্য তা অশনি সঙ্কেত। আওয়ামী-শিবির আর তাদের রণকুশলীরা তাই পরাজয়কে ঠেকিয়ে ক্ষমতায় থাকার ফন্দি ফিকির আঁটছে।

নির্বাচনের আগে বিএনপি যদি তীব্রতর আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে, তাহলে ক্ষমতাসীনদের শক্তি-সামর্থ্য ও সমর্থন ন্যূনতম পর্যায়ে নেমে আসবে। তখন নিশ্চিত পরাজয় ঠেকানোর জন্য সংসদের মেয়াদ বাড়িয়ে ক্ষমতায় বহাল থাকার একটি চিন্তা শাসক মহলে রয়েছে। যেসব দেশে স্বৈরাচার জেঁকে বসেছে, সেসব দেশে নির্বাচন না দিয়ে জাতীয় সংসদের মেয়াদ বাড়ানোর উদাহরণ রয়েছে। আরেকটি হচ্ছে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে আরো শক্তি প্রয়োগ আরো নির্মমতা প্রদর্শন করে ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা। যদি অবস্থা এরকম হয় যে, নিজেরা আর ক্ষমতায় থাকার মুরোদ নেই তখন ফখরুদ্দীন জাতীয় পদার্থের আমদানি হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা জরুরি অবস্থা সরকারের দুটো কাঠামো নিয়ে চিন্তা করছেন। প্রথমটি আওয়ামী লীগের পরোক্ষ সমর্থনে অপরটি আওয়ামী বিরোধীদের সমর্থনে। ২০০৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রথম দিকে বিএনপির আশীর্বাদপুষ্ট হলেও অবশেষে আওয়ামী লীগের পকেটে চলে যায়। এবারো বিষয়টি বুমেরাং হতে পারে। সে ক্ষেত্রে প্রফেসর ইউনূসের বদলে বিতাড়িত প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা বিরোধীদের সমর্থন পেতে পারেন।

প্রধান বিচারপতি হিসেবে, তার শক্ত ভূমিকার কারণে দেশে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে বলে বিশ^াস করা হয়। এ ছাড়া নিপীড়িত হওয়ার কারণে তার প্রতি জনগণের সহানুভূতি রয়েছে বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন। জরুরি সরকারের বাইরে ক্ষমতায় থাকার কৌশল হিসেবে জাতীয় সরকার গঠিত হতে পারে বলে এর আগে উল্লেখ করেছি। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ মহল আওয়ামী লীগের বর্তমান ক্ষমতা আরোহণের বিষয়টিকে বাঘের পিঠে সওয়ারের সাথে তুলনা করেন। বাঘের পিঠ থেকে নেমে যাওয়ার বিপদ অনেক। সুতরাং যতক্ষণ শ^াস ততক্ষণ আঁশ। তৃতীয় পক্ষকে আগের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো ডেকে আনা সহজ নয়। আজকের আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সমীকরণ এর অনুকূল নয়। তবে বাধ্যবাধকতার শেষ নেই। একজন বাংলাদেশী বিশেষজ্ঞ এক সময় তিনটি শক্তির অস্তিত্বের কথা রসিকতা করে বলেছিলেন। এ-আওয়ামী লীগ, বি-বিএনপি ও সি-ক্যান্টনমেন্ট; কিন্তু পদ্মা মেঘনা যমুনায় ইতোমধ্যে অনেক পানি গড়িয়েছে। সেই সহজ সমীকরণটি হয়তো নেই। সেনাবাহিনী এখন অনেক প্রফেশনাল। সিভিল সরকারের প্রতি অনুগত। সুতরাং সহজ করে কোনো কথা বলা সঙ্গত নয়। অনেকে অবশ্য এরশাদ সরকারের শেষ অবস্থার তুলনা দিয়ে থাকেন। এসব কথাবার্তা অনেকগুলো ‘যদি’ র ওপর নির্ভরশীল।

নির্বাচন যদি হয় তাহলে অথবা না হয় তাহলেও বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য ব্যক্তিত্ব। প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে তার আদেশ নিষেধ মেনে চলার জন্য দেশে কোটি কোটি মানুষ রয়েছে। তিনি দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী। তিনি কোনো নির্বাচনে কখনো হারেননি। বিএনপি তার আদর্শের সন্তান। বিএনপির এখন একমাত্র কর্মসূচি হচ্ছে খালেদা জিয়ার মুক্তি। বিএনপি তার ঘোষিত নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন এবং আইনগত লড়াই একসাথে চালিয়ে যাচ্ছে। খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা মনে করেন আইন যদি সত্যিই আইনের পথে চলে তাহলে তার মুক্তি না পাওয়ার কোনো কারণ নেই; কিন্তু আওয়ামী রাজনীতি বিশেষজ্ঞদের ধারণা ছলেবলে কলে কৌশলে সরকার নির্বাচন পর্যন্ত তাকে জেলে রাখতে চায়। যাতে বিএনপির পরাজয়টি নিশ্চিত করা যায়। আওয়ামী মহলের আশা যে খালেদাবিহীন বিএনপিকে ভাঙতে, কিনতে এবং নতজানু করতে অনেক সুবিধা হবে।

তাদের সে আশা নিরাশায় পরিণত করেছে বিএনপির যৌথ নেতৃত্ব। দেশের একজন প্রবীণ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় এই লেখককে বলেন, ‘এটা বিস্ময়ের ব্যাপার যে এই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দল কার্যকরভাবে যৌথ নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে।’ বিভেদ তো দূরের কথা বিএনপি এখন তার ইতিহাসের সবচেয়ে সংহত এবং ঐক্যবদ্ধ সময় অতিক্রম করছে। আওয়ামী বুদ্ধিজীবীরা এবং কিছু তাঁবেদার গণমাধ্যম বিএনপির ঐক্যে ফাটল ধরানোর চেষ্টা করছে; কিন্তু তারা অবাক বিস্ময়ে দেখছে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে নতুন নতুন মামলা ও ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও তাদের নতজানু করা যাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে দুঃখের সাথে বলতে হয় যে দুদক নিজেদের ন্যায় ও নিরপেক্ষতা ভঙ্গ করে বিএনপির স্ট্যান্ডিং কমিটির প্রায় সবার বিরুদ্ধে মামলার পাঁয়তারা করছে। সরকারি দল বিএনপিকে কাবু করতে না পেরে বিএনপিকে ছাড়াই নির্বাচনের নীলনকশা নিয়ে এগোচ্ছে।

তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা মহাজোট বহির্ভূত রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনে শামিল করে বিএনপি অংশগ্রহণ না করার ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছে। এরশাদ সোনার খাঁচায় থাকতে চাচ্ছেন না। তাকে সোনার শিকল পরানোর বুদ্ধি শুদ্ধি আঁটা হয়েছে। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী তারা সিপিবির সাথেও যোগাযোগ করেছে। তাদেরও কয়েকটি আসন দেয়া হবে বলে খবর বেরিয়েছে। এর বিপরীতে তারা ইসলামপন্থী দলগুলোর সাথেও যোগাযোগ করেছে বলে জানা গেছে। ইতোমধ্যে তারা হেফাজতে ইসলামকে গণভবনে তুলেছে। ২০ দলীয় জোটের এক অপভ্রংশকে ভয় ও লোভ দেখিয়েছে। কৌশলগতভাবে আরেকটি দলকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে; কিন্তু বিএনপি যদি নির্বাচনে অংশ না নেয়, তাহলে নির্বাচন দেশে এবং বিদেশে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। আর বেগম খালেদা জিয়াকে বাইরে রেখে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে না। সে ক্ষেত্রে খালেদা জিয়ার মুক্তি একটি অনিবার্য বিষয়।

একটি দৈনিক গত সপ্তাহে প্রতিবেদন লিখেছে, ‘এবার বিএনপি নির্বাচন বর্জন করলে ক্ষমতাসীন সরকার টিকবে না।’ তারা মনে করেন সে ক্ষেত্রে নির্বাচন হবে না। সরকার উপর্যুক্ত কৌশলে ক্ষমতায় থাকতে চাইবে। বিএনপি অবশ্য বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন ক্রমশ তীব্রতর করবে এবং সরকারকে সমঝোতায় আসতে বাধ্য করার পরিবেশ তৈরি করবে। বিএনপির রণকুশলীরা মনে করেন বিএনপিকে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন ও নির্বাচনের প্রস্তুতিÑ উভয় দিকেই অগ্রসর হতে হবে। পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন, ২০১৪ সালের বোগাস নির্বাচনের কৌশল এবার প্রয়োগ করা সম্ভব হবে না। জনগণ যদি অন্তত ভোট দেয়ার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয় তাহলে আওয়ামী কারসাজি ভেস্তে যাবে। বিএনপির দূরবর্তী কোনো কোনো শুভাকাক্সক্ষী নির্বাচনকে প্রাধান্য দিলেও শীর্ষ নেতৃবৃন্দ মনে করেন কোনোভাবেই খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে বিএনপি নির্বাচন করবে না। তারা মনে করেন, ক্ষমতার চেয়েও নীতি ও আদর্শ অত্যন্ত মূল্যবান। তারা কোনোভাবেই আপসহীন নেত্রীর ইমেজের বিপরীত কিছু করবেন না।

দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক ধোঁয়াশা বিদেশেও অনুরূপ অবস্থার সৃষ্টি করেছে। ‘বাংলাদেশ বিকেম দ্য হট বেড অফ ইন্টারন্যাশনাল ক্লিকস’ একজন নেতার বক্তব্য। এ অঞ্চলে বৃহৎ শক্তিসমূহের যে সমীকরণ চলছে তা হিসাব-নিকাশ কষছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা। তারা দেখাচ্ছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রধান মিত্র ভারতের প্রতি শ্রীলঙ্কা, নেপাল, মালদ্বীপ যে আচরণ প্রদর্শন করছে তাতে বাংলাদেশের প্রতি ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতি কৌশলের পরিবর্তন আসতে পারে। স্মরণ করা যেতে পারে যে, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কয়েক মাস আগে বলেছেন, ভারত বাংলাদেশের জনগণের বন্ধুত্ব চায়, কোনো দল বা গোষ্ঠীর নয়। এটা নিশ্চিত যে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় নেয়ার জন্য কংগ্রেসের অনুরূপ আচরণ করবে না। ভারতের কূটনীতিকেরা এটা বিশ^াস করেন, যে দলই ক্ষমতায় আসুক ভারতের বন্ধুত্ব তাদের জন্য অনিবার্য হয়ে উঠবে।

আর বিএনপিও ভারত বিরোধিতায় কৌশল অবলম্বন করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিদের কূটনৈতিক ভাষায় যা বুঝা যায় তা হলো তারা বাংলাদেশে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেখতে চায়। ২০১৪ সালের নির্বাচনে তাদের যে কূটনৈতিক ব্লাফ দেয়া হয়েছে তা হয়তো কূটনীতিকেরা ভোলেনি। চীনের রাষ্ট্রদূত বলেছেন, বাংলাদেশে তারা সব দলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন দেখতে চায়। এই প্রথমবারের মতো কোনো একজন চীনা রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে প্রত্যক্ষ মন্তব্য করলেন। দক্ষিণ এশিয়ায় পরাশক্তির স্বার্থের দ্বন্দ্ব এবং আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী চীন ও ভারতের পারস্পরিক প্রতিযোগিতার সমীকরণ বাংলাদেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের অনুকূলে। সুতরাং আগামী নির্বাচনে ঘরে বাইরে বিএনপির জন্য একটি ফলপ্রসূ সময় অপেক্ষা করছে। আর সে অপেক্ষার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া।

লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
Mal55ju@yahoo.com

 

সূত্র: নয়াদিগন্ত

খবরটি শেয়ার করুন..




Loading…








© All rights reserved 2018 somoyersangbad24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com