শনিবার, ২১ Jul ২০১৮, ১০:০৫ পূর্বাহ্ন




নির্বাচন প্রক্রিয়া ঠিক করবে জনগণ

নির্বাচন প্রক্রিয়া ঠিক করবে জনগণ




মো: সরোয়ার উদ্দিন: ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দাবি ‘অন্তর্বর্তী সরকার’ এবং মাঠের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির দাবি ‘সহায়ক সরকার’-এর অধীনে আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। এ নিয়ে বিভিন্ন শিবিরে যুক্তি, তর্ক, পাল্টাপাল্টি অবস্থান এবং টিভি টক’শোতে বিচার-বিশ্লেষণসহ বিভিন্ন আলোচনা-সমালোচনা এখন তুঙ্গে। এ সময় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যৌথ পরামর্শ কার্যক্রম (জেসিসি) বৈঠকের উদ্দেশ্যে ঢাকায় সফরে এলে বিএনপি সভানেত্রী বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচনকালীন ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ প্রসঙ্গটি উত্থাপন করলে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ সাফ জানিয়ে দেন- বাংলাদেশে কী প্রক্রিয়ায় নির্বাচন হবে তা ঠিক করবে দেশের জনগণ। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত হর্ষবর্ধন শ্রীংলা আরো সুস্পষ্ট করেন, ‘ভারত শুধু কোনো দল বা সরকারের সাথে বন্ধুত্ব নয় বরং বাংলাদেশের জনগণের বন্ধুত্ব চায়। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রদূত যথার্থ ও সঠিক কথাটি বলেছেন। দেশের প্রকৃত মালিক জনগণ, যা বাংলাদেশের সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে জনগণকে দেশের সার্বভৌম অধিকার দেয়া হয়েছে। তাই নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা ঠিক করার অধিকার দেশের জনগণেরই রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তির অধিকার একেবারেই গৌণ।

বিগত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০১৪-কে সামনে রেখে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার’ এবং প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ ২০ দলীয় ঐক্যজোটের ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’-এর দাবিতে চরম মতপার্থক্য ও পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি চলেছে। এ সময় আমি (২০.০৬.২০১২ থেকে ১৬.০২.২০১৩ পর্যন্ত) নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে দেশের বড় সাতটি জেলাÑ ঢাকা, কুষ্টিয়া, বরিশাল, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর ও নওগাঁর বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত শিক্ষিত, সচেতন ও দায়িত্বশীল ৩৬২ জন উত্তরদাতার স্বাধীন মতামতের ওপর ভিত্তি করে এক জরিপ পরিচালনা করি।
গবেষণায় দেখা যায়, এ পর্যন্ত দেশে চারটি পদ্ধতিতে মোট ৯টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে: অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দু’টি- ১৯৭৩ ও ১৯৯৯; প্রেসিডেন্ট শাসিত সরকার তিনটিÑ ১৯৭৯, ১৯৮৬ ও ১৯৮৮; নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে একটি- ১৯৯১ ও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে তিনটি- ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। শুধু নির্দলীয় সরকার ১৯৯১ এবং নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রথম দিকে হোঁচট খেলেও অবশেষে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে সুষ্ঠুভাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুসম্পূর্ণ করলেও বাদবাকি নির্বাচন নিয়ে যথেষ্ট সমালোচনা হয়েছে। দেশের রাজনৈতিক দল ও প্রেসিডেন্টের শাসনকালে ভিন্ন ও আলাদা নির্বাচন পদ্ধতি অনুসরণ করার মধ্য দিয়ে শুধু ক্ষমতাসীনদের নিজ ও দলীয় স্বার্থ হাসিলের জন্য নির্বাচন করে, কিন্তু এসব নির্বাচন দেশের সাধারণ জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা পূরণ করতে অনেকাংশে ব্যর্থ হয়।

এ অবস্থায় কোন প্রক্রিয়ায় নির্বাচন চায় দেশের সাধারণ জনগণ (মালিক); এ সম্পর্কে প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরার প্রয়াস পাওয়া যাবে এ গবেষণার মাধ্যমে। এ ছাড়া ইতঃপূর্বে অনুষ্ঠিত সব নির্বাচন পদ্ধতির গ্রহণযোগ্যতা, ভোটদান পদ্ধতি, এ দায়িত্বে নিয়োজিত সদস্যদের যোগ্যতা, নির্বাচন পরিচালনার জন্য বরাদ্দ সময়, নির্বাচন ব্যয় মূল্যায়নসহ জনগণের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা, এ নিরিখে সরকারি বিধিবিধান ও এগুলো প্রয়োগের জন্য ব্যবহৃত আধুনিক উপকরণাদি ইত্যাদিসহ দেশব্যাপী নির্বাচন প্রস্তুতি, ভোট প্রয়োগে জনগণের স্বাধীনতা সৃষ্টিসহ প্রভৃতি বিষয় মূল্যায়ন সাপেক্ষে একটি সবিস্তার চিত্র সবার কাছে তুলে ধরা, বিরাজমান অনিয়ম ও সমস্যাগুলো নিরসনকল্পে সুনির্দিষ্ট সুপারিশমালা এবং একটি আধুনিক নির্বাচন মডেল প্রস্তাব করাই এ গবেষণার মুখ্য উদ্দেশ্য।
যেকোনো গবেষণার প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহের জন্য উত্তরদাতা হিসেবে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের শিক্ষিত, আত্মসচেতন ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের নির্বাচন করা হয়। এ নিরিখে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, সরকারি ইনস্টিটিউট, মেডিক্যাল কলেজ, উচ্চবিদ্যালয়, কিছু সরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, সাংবাদিক, তথ্যপ্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং স্বাধীন পেশায় নিয়োজিত, আইনজীবী, পল্লী চিকিৎসক, ব্যবসায়ী, কৃষক, শিক্ষিত, সচেতন ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা প্রশ্নপত্র পূরণ সাপেক্ষে এ গবেষণায় প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করেছেন। এ গবেষণায় দেখা যায়, বর্তমানে রাজনৈতিক ব্যক্তি ও দলগুলো যতটুকু না দেশের উন্নয়ন ও কল্যাণে নিয়োজিত তার চেয়ে বেশি নিয়োজিত নিজ ও দলের স্বার্থ হাসিলে।

গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে এ পর্যন্ত বেশির ভাগ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে ব্যক্তিরা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের মনোনীত ও পছন্দনীয় বলে তাদের ইচ্ছামাফিক নির্বাচন পরিচালিত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে দেশের সাধারণ জনগণ (মালিক)-এর ইচ্ছা, আশা ও আকাক্সক্ষার প্রকৃত প্রতিফলন হয়নি। এমতাবস্থায় আগামী নির্বাচন কি আগের মতো রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তির ইচ্ছামাফিক অথবা তাদের দেয়া ফরমুলা অনুযায়ী হবে, নাকি দেশের জনগণ দিয়ে নির্বাচিত সৎ, যোগ্য ও দেশপ্রেমিক প্রতিনিধি দিয়ে হবে?

জরিপে পাওয়া তথ্য মোতাবেক ২.৫% (৯ জন) উত্তরদাতা বিভিন্ন ‘রাজনৈতিক দলের মনোনীত সদস্য’, ৬% (২২ জন) ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার’ ব্যবস্থা, ৩২.৩% (১১৭ জন) ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ এবং ৫৫.৮% (২০২ জন) দেশের ‘জনগণে নির্বাচিত সরকার’-এর পক্ষে এ গবেষণায় রায় দিয়েছেন। এ ছাড়া ১.১% (৪ জন) ‘সংবিধান মোতাবেক, ০.২% (১ জন) ’ নতুন দলের আগমন, ০.২% (১ জন) ‘সুশীল সমাজ’, ০.২% (১ জন) ‘শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন’ গঠন, ০.২% (১ জন) ‘স্বৈরাচারী শাসক’, ৩.৩% (১১ জন) অন্য ব্যবস্থা এবং ০.৮% (৩ জন) কোনো মন্তব্য করেননি।
২.৪% (৯ জন) ‘সততা’, ৫.৫% (২০ জন) ‘নিরপেক্ষতা’, ০.৮% (৩ জন) ‘ন্যায়পরায়ণতা’, ৫.২% (১৯ জন) ‘দেশপ্রেম’, ১.১% (৪ জন) ‘দায়িত্বশীল’ এবং ৮৪.৫% (৩০৬ জন) উপরোল্লিখিত সব গুণ নির্বাচনকালীন সরকারের অবশ্যই থাকা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন।
৬.৩% (২৩ জন) শুধু জাতীয় নীতিনির্ধারণ, ৫৯.৯% (২১৭ জন) প্রশাসনিক ও নির্বাহী ক্ষমতা এবং ৩১.৪% (১১৪ জন) উল্লিখিত সব ক্ষমতা থাকা উচিত বলে জানিয়েছেন।

নির্বাচনকালীন সরকারের মোট সদস্যসংখ্যা ৮.৮% (৩২ জন) উত্তরদাতার মতে ‘তিনজন সদস্য’, ৩১.৪% (১১৪ জনের) মতে ‘সাতজন সদস্য’, ৪১.৪% (১৫০ জন) উত্তরদাতা ‘১১ জন সদস্য’ এবং অবশিষ্ট উত্তরদাতারা ভিন্ন ভিন্ন সদস্যসংখ্যা উল্লেখ করেছেন।

এ ক্ষেত্রে সর্বাধিক ‘তিন মাস’-এর পক্ষে রায় দিয়েছে ৫৬.৬% (২০৫ জন) উত্তরদাতা, ‘ছয় মাস’- এর কথা বলেছেন ১৯% (৬৯ জন), ‘১২ মাস’ উল্লেখ করেছেন ১৪.৬% (৫৩ জন) এবং ৯.৬% (৩৫ জন) বিভিন্ন সময় ও মেয়াদে নির্বাচনকালীন সরকার সর্বাধিক ক্ষমতায় থাকার সময়সীমা এ গবেষককে জানিয়েছেন।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩২.২% (১১৩ জন) ‘ম্যানুয়াল’, ৫০% (১৮১ জন) ‘ই-ভোটিং’ এবং ১৮.২% (৬৬ জন) উভয় ‘ম্যানুয়াল ও ই-ভোটিং’ পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণের পক্ষে রায় দিয়েছেন।
নির্বাচনকালীন সরকারের সদস্যরা দায়িত্ব ও কার্যকলাপের জন্য জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবেন জনগণের কাছে, ‘হ্যাঁ’ ৯৭.৫% (৩৫৩ জন) উত্তরদাতা এবং ‘না’ ১.৬% (৬ জন) উত্তরদাতা গবেষককে মতামত দিয়েছেন।
গবেষণায় পাওয়া সর্বাধিক জনগণের মতামতের ওপর ভিত্তি করে জনগণে নির্বাচিত ‘নিরপেক্ষ নির্বাচক সংস্থা’ মডেলটি প্রণয়ন করা হয়েছে।-নয়াদিগন্ত

খবরটি শেয়ার করুন..




Loading…








© All rights reserved 2018 somoyersangbad24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com