শুক্রবার, ১৭ অগাস্ট ২০১৮, ১১:৪০ পূর্বাহ্ন




বহুল আলোচিত লিপা রানীর লাশ ইসলামী রীতিতে দাফন

বহুল আলোচিত লিপা রানীর লাশ ইসলামী রীতিতে দাফন




আলমগীর হোসেন, ডোমার (নীলফামারী) প্রতিনিধিঃ নীলফামারীর ডোমার উপজেলার বোড়াগাড়ী ইউনিয়নের লালার খামার এলাকায় আইনি জটিলতায় চার বছরের অধিক সময় ধরে হিমঘড়ে থাকা ধর্মান্তরিত হোসনে আরা লাইজুর (লিপা রানী) মরদেহ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ইসলামী ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী দাফন সম্পন্ন করেছে উপজেলা প্রশাসন।

শুক্রবার বিকেল ৩টা ১৫মিনিটে ওই গ্রামে তার স্বামী হুমায়ুন কবির লাজুর কবরের পাশে তাদের পারিবারিক কবরস্থানে লিপা রানীকে শায়িত করা হয়।
নীলফামারী জেলা প্রশাসকের নির্দেশে ডোমার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে ফাতিমা, অফিসার ইনচার্জ(ওসি)তদন্ত ইব্রাহিম খলিলসহ বিপুল সংখ্যক পুলিশের উপস্থিতিতে দাফন কাজ সম্পন্ন করে। এসময় ওই এলাকায় হাজার হাজার উৎসুক মহিলা পুরুষের ভিড় জমে। জনতার ভিড় সামলাতে হিমসিম খায় প্রশাসন। লিপা রানীর মরদেহ ইসলামী ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী দাফনের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

আদালতের দেয়া রায়ের কপি হাতে পাওয়ার তিন দিনের মধ্যে মরদেহ দাফন করতে হবে। গত ১২ এপ্রিল হাইকোর্টের বিচারপতি মো. মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরীর একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এ সংক্রান্ত একটি আদেশ দেন। নীলফামারীর জেলা প্রশাসককে এই নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেট ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে দাফন কাজ স¤পন্ন করতে হবে। দাফনের আগে হোসনে আরা লাইজু (লিপা রানীর) মরদেহ তার বাবার পরিবারকে দেখার সুযোগ দিতে বলা হয়েছে। জেলা প্রশাসন ৩মে রায়ের কপি হাতে পাওয়ার পর ডোমার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলে। সে অনুযায়ী ইউএনও উম্মে ফাতিমা শুক্রবার সকালে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘড়ে থেকে মরদেহটি ডোমারে নিয়ে এসে দাফনের ব্যবস্থা করেন।

মামলার বিবরণে জানা যায়, নীলফামারী জেলার ডোমার উপজেলার বামুনিয়া ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের খামার বামুনিয়া গ্রামের স্কুল শিক্ষক অক্ষয় কুমার রায়ের মেয়ে লিপা রানী রায় পার্শ্ববর্তী বোড়াগাড়ী ইউনিয়নের লালার খামার গ্রামের জহুরুল ইসলামের ছেলে হুমায়ুন কবির লাজুর সাথে ভালবেসে ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম দিকে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেন। ধর্মান্তরিত হবার পর লিপার রানীর নতুন নাম হয় হোসনে আরা লাইজু। কিন্তু বাধঁসাধে লিপার পরিবার। বিয়ের পর লিপার বাবা ডোমার থানায় একটি অপহরন মামলা দায়ের করেন। পুলিশ লিপাকে উদ্ধার করে আদালতে পাঠায়। লিপাকে তার বাবা নাবালিকা দাবী করায় আদালত তাকে রাজশাহীস্থ সেভ কাষ্টরিতে রাখার নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে মামলার ধার্য্য তারিখে লিপা রানীকে আদালতে নিতে উভয় পক্ষের পরিবার ট্রেন যোগে রাজশাহী থেকে নীলফামারী ফেরার পথে দিনাজপুর জেলার বিরামপুর রেল স্টেশনে হুমায়ুন কবির লাজু হটাৎ অসুস্থ্য হয়ে পড়লে তাকে বিরামপুর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে কর্তব্যরত চিকিৎসক রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করেন। হাসপাতালে নেয়ার পথেই লাজু মারা যায়। এর ৫৪ দিন পর হোসনে আরা লাইজুর (লিপা রানী) পরিবার লিপাকে অন্যত্র বিয়ে দেয়ার প্রস্ততি নিলে লিপা আত্মহত্যা করে। আত্মহত্যার আগে লিপা তার স্বামীর কবরের পাশে তাকে দাফনের জন্য চিরকুট লিখে যায়। লিপা রানীর মরদেহ ময়না তদন্তের জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে নেয়া হয়। সেখানে ময়না তদন্তের পর মরদেহটি হিমঘরে পড়ে আছে।

মরদেহটি নিজের মেয়ের বলে দাবি করে সনাতন ধর্মমতে সৎকার করার আবেদন করেন বাবা অক্ষয় কমার রায়। আর পুত্রবধূ হিসেবে দাবি করে তাকে মুসলমান রীতিতে দাফনের আবেদন জানান শ্বশুর জহুরুল ইসলাম। ভালবেসে ধর্মান্তরিত হয়ে বিয়ে করার কারণে মরদেহ নিয়ে এমন আইনি লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েন ছেলে ও মেয়ের পরিবার। লিপার বাবা অক্ষয় কুমার রায় নীলফামারী সদর কোর্টে মেয়ের মরদেহ চেয়ে মামলা করেন। কিন্তু মামলার রায়ে অক্ষয় কুমার হেরে যান। পরে তিনি সাব জজ আদালতে আপিল করেন। সেখানে ছেলের বাবা জহুরুল ইসলাম হেরে যান।এর পর ছেলের বাবা হাইকোর্টে আপিল করেন। মরদেহের দ’ুজন দাবিদার হওয়ায় সেখানেও সৃষ্টি হয় আইনি জটিলতা। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে মরদেহ হস্তান্তর করতে পারেনি।এভাবেই লিপা রানীর মরদেহ হিমঘড়ে কেটে যায় ৪বছর। অবশেষে গত ১২ এপ্রিল হোসনে আরা লাইজু (লিপা রানী) মরদেহ ইসলামী ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী দাফন করার নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী লিপার মরদেহ দাফন করেন প্রশাসন।

লিপা রানীর শ্বশুর জহুরুল ইসলাম জানান, আমার ছেলে ভালোবেসে নীলফামারী আদালতে এফিডেভিট করে লিপাকে বিয়ে করেছিল। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, ছেলে-মেয়ে দুজনই মারা গেছে। আমার ছেলে ও বৌমা এক সাথে থাকতে না পেরে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে। বৌমাকে আমার ছেলের কবরের পাশে দাফন করে তাদের এক করে দিতে পেরেছি। এতেই আমার শান্তি।উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে ফাতিমা জানান,আদালতের নির্দেশে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘড় থেকে লাশ এনে দাফন করা হয়েছে।

খবরটি শেয়ার করুন..




Loading…








© All rights reserved 2018 somoyersangbad24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com