শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ১২:৫৪ অপরাহ্ন



আধুনিক স্বাস্থ্যনীতি বাস্তবায়নে পল্লী চিকিৎসকদের ভূমিকা

আধুনিক স্বাস্থ্যনীতি বাস্তবায়নে পল্লী চিকিৎসকদের ভূমিকা



ডা. মো. জামাল উদ্দিন: অন্ন বস্ত্র বাসস্থান স্বাস্থ্য শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। বেঁচে থাকার জন্য যেমন খাদ্য গ্রহণ করতে হয়, তেমনি সুস্থ জীবনধারণের জন্য প্রয়োজন চিকিৎসা ব্যবস্থার। এই চিকিৎসাসেবায় যারা জড়িত তাদের দেবদূতও বলা হয়। মহান পেশা চিকিৎসা সেবা। এই পেশায় বাংলাদেশের প্রতিটি শহর ও গ্রামগঞ্জের মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসা সেবায় প্রায় ১০ লক্ষেরও অধিক পল্লী চিকিৎসক ও পল্লী দন্ত চিকিৎসকগণ নিয়োজিত আছেন।

তারা রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে রাত বিরাতে রোগীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেবা দিয়ে বিরাট জনগোষ্ঠীর আস্থা অর্জন করেছেন কেননা একটি স্বাস্থ্যসমৃদ্ধ জাতি দেশের সার্বিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের সংবিধানে স্বাস্থ্যসেবা ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতি সাধন রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব ও কর্তব্য হিসেবে স্বীকৃত। এই অঙ্গীকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল বাংলাদেশ সরকার সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার আলোকে স্বাস্থ্যখাতকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে গ্রহণ করেছে।

গত দুই দশকে এ খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। প্রজনন হার ও মৃত্যু হার হ্রাস, গড় আয়ু বৃদ্ধি, নবজাত শিশু ও মাতৃ-মৃত্যু হ্রাসের পাশাপাশি চিকিৎসা সেবার আধুনিকায়নে ও প্রসারের ক্ষেত্রে বিনিয়োগের মাধ্যমে অবকাঠামো উন্নয়ন ও নতুন অবকাঠামো স্থাপন অব্যাহত রয়েছে। জনগণের প্রত্যাশা ও সরকারি সম্পদের দিকে লক্ষ্য রেখে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার পরিধি ও মান বৃদ্ধি করা হচ্ছে। বর্তমান সরকার দেশের সকল মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হচ্ছে- দেশের সকল মানুষের বিশেষ করে নারী, শিশু ও দরিদ্র জনসাধারণের জন্য যথাযথ মানসম্পন্ন মৌলিক স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা নিশ্চিত করা। দেশের মোট জনসংখ্যার জন্য রেজিস্টার্ড চিকিৎসক রয়েছেন ষাট হাজারের মতো।

এদের সিংহভাগ থাকেন শহরে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, উপজেলা প্রতি চার থেকে পাঁচ লাখ লোকের জন্য চিকিৎসক আছেন সর্বোচ্চ দশ জন। এদের এই শূন্যতা পূরণ করে আসছে গ্রাম ডাক্তার, পল্লী চিকিৎসক ও পল্লী দন্ত চিকিৎসকরা। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৮৫ ভাগ মানুষ গ্রামাঞ্চলে বসবাস করে। এই গ্রামাঞ্চলে এমবিবিএস পাশ করা ডাক্তার নেই বললেই চলে, ফলে গ্রাম পর্যায়ের বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীকে স্বাস্থ্যসেবার জন্যে পল্লী চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হতে হয়। পল্লী চিকিৎসক বা গ্রাম ডাক্তারগণ গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় তাৎপর্যপূর্ণ ভুমিকা পালন করছেন।

যথা- (১) দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ বাড়ির দোড়গোড়ায় অত্যাবশ্যকীয় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পল্লী চিকিৎসকদের মাধ্যমে পেয়ে থাকেন। (২) গ্রামের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য বিষয়ক সচেতনতা বাড়াতে পল্লী চিকিৎসকগণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। (৩) স্বাস্থ্য বিষয়ক বিভিন্ন পরামর্শ প্রদানের মাধ্যমেও পল্লী চিকিৎসকগণ স্বাস্থ্য সেবায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। (৪) প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা, শিশু ও মায়ের স্বাস্থ্যসেবা, টিকাদান, পরিবার পরিকল্পনা, সংক্রমক রোগ প্রতিরোধ, যক্ষা রোগ সনাক্তকরণ ও চিকিৎসা, অপুষ্টিজনিত রোগের চিকিৎসা, যৌনবাহিত রোগের চিকিৎসা, এইচআইভি/এইডস সনাক্তকরণ, সকল প্রকার সাধারণ রোগের চিকিৎসা প্রভৃতি ক্ষেত্রে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে পল্লী চিকিৎসকগণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।

(৫) আমাদের দেশে এমবিবিএস পাশ করা ডাক্তারের যথেষ্ট অভাব রয়েছে, সেক্ষেত্রে বিশেষ করে গ্রাম পর্যায়ের চিকিৎসা ব্যবস্থায় পল্লী চিকিৎসকদের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব অনস্বীকার্য। (৬) দ্রুততম সময়ের মধ্যে তৃণমূল জনগণের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে পল্লী চিকিৎসকগণ ভূমিকা রাখতে পারে। পল্লী চিকিৎসকদের ন্যূনতম এসএসসি পাশ ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ গ্রহনের পর সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে চিকিৎসা কার্যক্রম চালানো উচিত। এতে পল্লী চিকিৎসকদের মর্যাদা বাড়বে এবং মানুষের সু-চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। উল্লেখ্য যে, বর্তমানে অনেক উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তিগণও পল্লী চিকিৎসায় নিয়োজিত রয়েছেন, তাদেরকেও প্রয়োজনীয় এবং যথোপযুক্তমানের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে পেশাগত দক্ষতা অর্জন করা আবশ্যক।

চিকিৎসা পেশা অন্যান্য পেশার তুলনায় স্পর্শকাতর এবং শারীরিক ও মানসিক কষ্ট বা অসুস্থতা তথা জীবন-মৃত্যুর সমস্যার সঙ্গে জড়িত হওয়ায় ন্যূনতম শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ছাড়া এই পেশায় নিয়োজিত হওয়া উচিত না। এই বিষয়ে সরকার আগ্রহী ও উপযুক্ত ব্যক্তিদেরকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদান করে পল্লী চিকিৎসক তৈরীর মাধ্যমে গ্রামীণ মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারেন। ২০০৮ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির তালিকায় স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবার কল্যাণ বিষয়ে প্রতিশ্রুতি ছিল (১১.১)। সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পূর্বতন আওয়ামী লীগ সরকারের (১৯৯৬-২০০১) প্রণীত জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি পুনর্মূল্যায়ন করে যুগের চাহিদা অনুযায়ী নবায়ন করা হবে। এই নীতির আলোকে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রতিষ্ঠিত ১৮ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক চালু, পুষ্টি, শিশু ও মাতৃমঙ্গল নিশ্চিত করা হবে।

জনসংখ্যানীতি যুগোপযোগী করা, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে। বর্তমান সরকার এ পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিকে এই কার্যক্রম চালু করেছে। এসব কমিউনিটি ক্লিনিকের জন্য ১৩ হাজার ৫০০ কমিউনিটি হেলথকেয়ার প্রোভাইডার নিয়োগের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানা যায়। তবে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রাথমিক স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সেবা প্রদানের লক্ষ্যে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ১৮ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক পুরোপুরি চালু করা প্রয়োজন কারণ দেশের গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী শতকরা ৮৫ ভাগ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পল্লী চিকিৎসক, পল্লী দন্ত চিকিৎসক ও কমিউনিটি ক্লিনিকের ভূমিকা ব্যাপক। আমাদের দেশে স্বাস্থ্য খাতে যথেষ্ট নেতিবাচক চিত্র বিদ্যমান।

একদিকে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের সম্পদ ও সামর্থের সীমাবদ্ধতা অন্যদিকে সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে নানা ধরণের অনিয়মের কারণে সেবা গ্রহীতারা অনেক ক্ষেত্রেই কাঙ্খিত সেবা প্রাপ্তি হতে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে স্বাস্থ্যসেবার প্রতি জনসাধারণের একটি নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে। এই অবস্থার পরিবর্তন হওয়া জরুরী। মানুষ সরকারি কিংবা বেসরকারি হাসপাতাল হতে স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়মের শিকার হচ্ছে। কমিউনিটি ক্লিনিকসহ স্বাস্থ্যসেবার সকল স্তর থেকে দুর্নীতি ও অনিয়ম দূর করতে হবে। দেশের সকল মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে এই খাতের সকল দুর্নীতি ও অনিয়মের অবসান করতে হবে।

বর্তমান বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং প্রয়োজনে নতুন আইন তৈরি করতে হবে। স্বাস্থ্যসেবায় চিকিৎসক ও নার্সসহ সংশ্লিষ্টদের মানবিক হতে হবে। সকলকে স্ব-স্বক্ষেত্রে সততা ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করতে হবে। আমি দীর্ঘ ২৭ বছর ধওে গ্রামীণ জনপদের অবহেলিত, চিকিৎসাসুবিধা বঞ্চিতদের চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসছি। আমার অভিজ্ঞতার আলোকে সাধারণত চিকিৎসা সংক্রান্ত শিক্ষা গ্রহণ ও জীবিকা নির্বাহে চিকিৎসকদের কর্মপন্থা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন রূপ হয়ে থাকে। কিন্তু পল্লী চিকিৎসক ও পল্লী দন্ত চিকিৎসকগণ বরাবরই অবহেলিত, চিকিৎসা সেবা বঞ্চিতদের সেবা দিয়ে আসছেন।

বৃহত্তর চট্টগ্রাম ডেন্টাল এসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবে মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সাথে পল্লী দন্ত চিকিৎসক ও পল্লী চিকিৎসকদের সুবিধা অসুবিধা নিয়ে মতবিনিময় করার সুযোগ আমার হয়েছে। মতবিনিময়কালে তিনি বলেন, শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় এসে মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে স্বাস্থ্যবান্ধব কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। সরকারের স্বাস্থ্যনীতি বাস্তবায়নের ফলে স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ পাচ্ছে জনগণ এবং সকল জনগোষ্ঠী ও শহরের নাগরিকরা স্বাস্থ্যসেবার সমান সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকারের এই কর্মসূচি সফল করতে এবং পরিকল্পিত আধুনিক ডিজিটাল স্বাস্থ্যনীতি বাস্তবায়নে পেশাজীবী চিকিৎসকদের পাশাপাশি ডিপ্লোমা ডেন্টাল ডক্টর, পল্লী চিকিৎসক, পল্লী দন্ত চিকিৎসকদের এগিয়ে আসতে হবে। সরকার ইতিমধ্যে পল্লী চিকিৎসকদের ও ডিপ্লোমা ডেন্টালদের পেশার মান উন্নয়নে প্যারামেডিকেল বোর্ড গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যা দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে। সাধারণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা ও দায়িত্বশীল অবদান রাখায় পল্লী দন্ত চিকিৎসকদের ও পল্লী চিকিৎসকদের ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মহোদয়।

ধারণা মতে, চিকিৎসাসেবার বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগসহ সকল ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। একটি সুস্থ সবল জনগোষ্ঠীই শুধু দেশকে উন্নতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। এ জন্যে প্রয়োজন স্বাস্থ্য সচেতনতা, রোগ প্রতিরোধমূলক প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ এবং যথাযথ চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা। সে লক্ষ্যে যথাযথ কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে সরকার ও সংশ্লিষ্টগণ আরো সচেষ্ট হবেন বলে আশা করছি।

লেখক: প্রাথমিক দন্ত চিকিৎসক,
সভাপতি, বৃহত্তর চট্টগ্রাম ডেন্টাল এসোসিয়েশন

খবরটি শেয়ার করুন..








© All rights reserved 2018 somoyersangbad24.com

Desing & Developed BY W3Space.net