শুক্রবার, ২২ মার্চ ২০১৯, ১০:২৭ পূর্বাহ্ন



স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে নারী চা শ্রমিকরা

স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে নারী চা শ্রমিকরা



মৌলভীবাজার জেলায় ৯৩টি চা বাগানে নারী চা শ্রমিকরা যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবায় এখনও পিছিয়ে রয়েছে। শ্রমিক লাইনের বসতভিটায় স্যানেটারি ল্যাট্রিন ব্যবস্থা না থাকায় চা বাগানের খোলা জায়গায় মল ত্যাগ করতে হয় তাদের। সেখানে রয়েছে বিশুদ্ধ সুপেয় পানির অভাব।

এছাড়া শ্রমিকদের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা না থাকায় চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছেন প্রসূতি নারী শ্রমিকরা। মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার সাতগাঁও ইউনিয়নের কাঁঠাল টিলা শ্রমিক লাইন ও আমরাইল চা বাগানের গুঁটিবাড়ি শ্রমিক লাইন সরজমিনে নারী শ্রমিকদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়।

যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যের একটি বড় অধ্যায় বিয়ে। চা শ্রমিকের বেলায় বাবা-মায়েরা মেয়েদের দ্রুত বিয়ে দেয়াটাই ভাল বলে মনে করেন। বিয়ের পর অপুষ্ট অল্পবয়সী মেয়েটিকে প্রমাণ করতে হয় সে বন্ধ্যা নয়। আর ১৫/১৬ বছরে অপুষ্ট শরীরে সন্তান ধারনের কারণে তারা গর্ভকালীন ও প্রসবকালীন জটিলতায় পড়ে, এমনকি মারাও যায়।

এছাড়া চা বাগানের নারী শ্রমিকরা পিরিয়ডকালীন সময় স্বাস্থ্যসম্মত স্যানেটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করার সুযোগ পান না। তারা স্যানেটারি ন্যাপকিনের পরিবর্তে একই কাপড় বার বার ব্যবহার করেন।

তাই সেখানে স্যানেটারি ন্যাপকিন বিনামূল্যে চালুর বিষয়টি চা বাগান মালিক ও চা সংশ্লিষ্টদের বিবেচনা করা উচিত মনে করে স্কুল পড়ুয়া হুগলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের কিশোরী শেফালী দাস।

সাতগাঁও চা বাগানে কাঁঠালটিলা লাইনের রিনা রিকিয়ানের (২৬) সাথে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। ৬ বছর আগে কার্তিক রিকিয়াননের সাথে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর তার ঘরে শিউলী রিকিয়ান নামে কন্যা শিশু জন্ম নেয়। বর্তমানে শিউলীর বয়স আড়াই বছর।

১১দিন আগে তিনি আরেকটি পুত্র শিশু জন্ম দেন। দাইয়ের মাধ্যমে নরমাল ডেলিভারি হয়েছে তার নিজ বাড়িতে। অস্থায়ী শ্রমিক হিসেবে রিনা ১০২ টাকা মজুরিতে চা পাতি তোলার কাজ করেন।

রিনা বলেন, গর্ভকালীন সময় শাক-সবজি, করলা বরবটি খাইছি। মাঝে মধ্যে মাছ ও মাংস খাইছি। সব সময় তো খাওয়া সম্ভব হয়নি।

খোকন দাসের স্ত্রী শুকুর মণি দাস (১৯)। বর্তমানে তিনি ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। তিনি আমরাইল চা বাগানের গুটিবাড়ী লাইনের বাসিন্দা। শুকুর মণি তার শাশুড়ি নির্মলা দাসের (৬০) বদলী (অস্থায়ী) শ্রমিক হিসেবে ৪ বছর ধরে কাজ করছেন।

২০১৪ সালে শুকুর মণির বিয়ে হয়। তার বাড়ি সিলেটের দলদলি চা বাগানে। সিলেট কাজী জালাল উদ্দিন বহুমূখী বালিকা বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় তার বাবা তাকে বিয়ে দেন শ্রীমঙ্গলের আমরাইল ছড়া চা বাগানে।

শুকুর মণির গত ১০ সেপ্টেম্বর চা বাগানে মাও শিশু স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্য বই সুত্রে জানা যায়, তার কর্মস্থলের দূরত্ব ৩ কিলোমিটার। তিনি পায়ে হেঁটে কাজে যান। সময় লাগে সোয়া এক ঘণ্টা। তার রোজগারে পরিবারের চার সদস্যের ভরণ পোষণ চলছে। তিনি দুইবার হাসপাতালে ও দুই বার কমিউনিটি ক্লিনিকে সেবা নিয়েছেন।

স্যানেটিশনের ব্যাপারে জানতে চাইলে শুকুর মণি জানান, চা বাগানের ভেতরে খোলা মাঠে মলমূত্র ত্যাগ করেন। সেখানে পানির কোনো সুব্যবস্থা নেই। বাড়িতেও তার কোনো স্যানেটারি ল্যাট্রিনের ব্যবস্থা নেই।

খাবারের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সবজি খাই, তবে সব সময় মাছ মাংস খেতে পারি না।

একই লাইনের ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ইসুরী দাস (১৮), তার স্বামী আপন দাস, তিনি একজন রাবার বাগানের শ্রমিক।

ইসুরী দাসের বাগানে কোনো কাজ না থাকায় তিনি বাড়িতে থাকেন। তার অবস্থাও একই।

তবে তাদের মধ্যে কেউ মাতৃত্বকালীন ভাতা পাচ্ছেন না।

বাগানগুলোর শ্রমিক লাইন অনেকটা গুচ্ছগ্রামের মতো।

এসব লাইনের শতাধিক শ্রমিক পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, পর্যাপ্ত টিউবওয়েল না থাকায় কুয়োর পানিতে বাসন ধোয়া থেকে শুরু করে পানও করে থাকেন। এসব শ্রমিক লাইনের জীর্ণ বসতবাড়ির জন্য স্বাস্থ্যকর কোনো স্যানেটারি ল্যাট্রিন নেই। চট ও পুরোনো প্লাস্টিকের বস্তা দিয়ে কাঁচা টয়লেট দেখা গেছে কয়েকটি পরিবারে।

শ্রমিকরা জানান, টয়লেট না থাকায় তারা দিনে রাতে নম্বরে (চা চারা বাগান) গিয়ে মূলমুত্র ত্যাগ করতে বাধ্য হতে হয়। এতে করে চা বাগানগুলোতে নারী শ্রমিক বিশেষ করে গর্ভবতী মায়ের চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে থাকেন।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরী বলেন, চা শ্রমিকরা সঠিক হিসাব রাখতে পারে না। বিশেষ করে গর্ভবতী নারীরা। সঠিক সময় ছুটি যেতে পারে না। তবে এটা বড় ধরনের সমস্যা। অনেকে মাতৃত্বকালীন ছুটি নেয় তিন মাসের। কিন্তু তিন মাস অতিক্রম করার পর দেখা গেছে তার প্রসব হয়নি।

চা শ্রমিকদের আইন নিয়ে তিনি বলেন, রাষ্ট্র আইন করবে তার নাগরিকের কল্যাণের জন্য। কাউকে বঞ্চিত করার জন্য কোনো আইন হতে পারে না। চা শ্রমিকদের বড় ধরনের আইন হয়নি। এ জন্য নতুন আইন প্রণয়নের পাশাপাশি শ্রম আইন আরো যুগোপযোগী ও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

শ্রীমঙ্গল উপজেলার স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জয়নাল আবেদিন টিটো বলেন, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ৬ হাজার ১৬২ জন নারীর সুস্থ ও নিরাপদভাবে সন্তান জন্ম দিয়েছেন। এর মধ্যে ১ হাজার ৪২১ জন নারী ছিলেন চা শ্রমিক। এই সময়ে গর্ভবতী নারীর মৃত্যু সংখ্যা ছিল ১১ জন, আর কেবল চা বাগান এলাকায় মারা গেছেন ৭ জন নারী।

তিনি বলেন, ৯টি চা বাগানে ৩১টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। তাদের কার্যক্রম আরো বাড়বে। যারা গর্ভবতী নারী কমিউনিটি ক্লিনিকে আসবে, তারা স্বাস্থ্য পরামর্শ গ্রহণ করবে। আর যারা আসবে না তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বাস্থ্য পরিদর্শিকা পরামর্শ দিবেন। শ্রীমঙ্গল হসপিটালে সপ্তাহে ৬দিন জরায়ু ক্যান্সার পরীক্ষা করা হবে বলে জানান তিনি।

খবরটি শেয়ার করুন..








© All rights reserved 2018 somoyersangbad24.com
Desing & Developed BY W3Space.net