শুক্রবার, ২২ মার্চ ২০১৯, ১০:২০ পূর্বাহ্ন



কালের সাক্ষী কুড়িগ্রামের নাওডাঙ্গার জমিদার বাড়ি

কালের সাক্ষী কুড়িগ্রামের নাওডাঙ্গার জমিদার বাড়ি



সাইফুর রহমান শামীম, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি : প্রায় দেড় শত বছরের পুরনো কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীর নাওডাঙ্গার ঐতিহ্যবাহী জমিদার বাড়িটি জরাজীর্ণ অবস্থায় কালের সাক্ষী হিসেবে আজও টিকে আছে। অবিভক্ত ভারত বর্ষে নাওডাঙ্গা পরগনার জমিদার বাহাদুর শ্রীযুক্ত প্রমদা রঞ্জন বক্সী এটি নির্মাণ করেন। এই পরগনার অধীন বিদ্যাবাগিশ, শিমুলবাড়ী, তালুক শিমুলবাড়ী, রসুন শিমুলবাড়ী ও কবির মামুদ প্রভৃতি জায়গায় তাঁর জমিদারি ছিল। রাজারহাটের পাঙ্গা এলাকায় প্রমদা রঞ্জন বক্সীর আরেকটি জোত ছিল।

এটির দেখাশোনাসহ পরিচালনার ভার দিয়েছিলেন শিব প্রসাদ বক্সীকে। কুমার বাহাদুর বীরেশ্বর প্রসাদ বক্সী, বিশ্বেস্বর প্রসাদ বক্সী ও বিপুলেশ্বর প্রসাদ বক্সী এ তিনজন জমিদার ছিলেন। মেয়ে ছিল পুটু। বিয়ে হয় রংপুর জেলার মীরবাগের জমিদারের সঙ্গে। তার প্রথম ছেলে বীরেশ্বর প্রসাদ বক্সী পাশ্চাত্যে পড়ালেখা করে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে কলকাতায় আইন পেশায় কর্মময় জীবন শুরু করেন। তিনি একজন বিচারক ছিলেন।
তার দ্বিতীয় ছেলে বিশ্বেস্বর প্রসাদ বক্সীর হাতে জমিদারির ভার ন্যস্ত করে জমিদার প্রমদা রঞ্জন অবসর নেন। তৃতীয় ছেলে বিপুলেশ্বর প্রসাদ বক্সী ছিলেন প্রকৌশলী। কথিত আছে, পরবর্তী জমিদার জমিদারির ভার নেওয়ার আগে তৎকালীন সময়ে পর পর তিনবার প্রবেশিকা পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন। তার বাবা জমিদার প্রমদারঞ্জন বক্সী তার ছেলেকে বলেন, ‘তোমার ভাগ্য খারাপ। অনেক ভাগ্যগুণে তুমি আমার সন্তান হিসেবে জন্ম নিয়েছ। বাকিরা যেহেতু পড়ালেখা শিখে অন্য কিছু হতে চায় সেহেতু তোমাকেই আমি আমার জমিদারির ভার দিতে চাই।’ পরে তাকে এ দায়িত্ব দেয়া হয়। সে আমলে সেখানে তিনি একটি মাইনর স্কুল গড়ে দেন।

সেটি বর্তমানে নাওডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয় ও নাওডাঙ্গা স্কুল অ্যান্ড কলেজে পরিণত হয়েছে। শিক্ষার পাশাপাশি শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি জমিদার বিশ্বেস্বর প্রসাদ বক্সী ছিলেন সমান অনুরাগী। তার ইচ্ছায় সে সময় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পূর্ণ জন্ম তিথি উপলক্ষে প্রতি বছর দোল পূর্ণিমায় জমিদার বাড়ির সামনে বিস্তীর্ণ ফাঁকা মাঠে দোলের মেলা বসতো।

মেলায় বিভিন্ন এলাকা থেকে দোল সওয়ারীরা বাহারি সাজে সজ্জিত হয়ে দোল মূর্তি সিংহাসনে নিয়ে এই দোলের মেলায় অংশ নিতে, যা এখনও বর্তমান। ১৩০৪ সালের ভূমিকম্পের পরে অন্য দুই ভাই কোচবিহারে স্থায়ী বসবাসের জন্য একটি বাড়ি কেনেন। তারা অনেক অনুনয় বিনয় করে তাদের বাবাকে সেখানে নিয়ে যান।

সেই বাড়িতে তাদের বাবা-মা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তবে তিনি শুধু জমিদারি নিয়ে পড়েছিলেন নাওডাঙ্গায়। জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর তিনি সব কিছু ছেড়ে ভারতের কোচবিহার জেলায় চলে যান। তবে সর্বশেষ চল্লিশ সনের রেকর্ডে নাওডাঙ্গার সমস্ত জমি তার নামেই হয়েছে। জমিদার বাড়ির গোমস্থা গঙ্গাধর বর্মণের নাতি বিজয় চন্দ্র বর্মণ ও শৈলান চন্দ্র বর্মণ ইতিহাসের অন্তরালে হারিয়ে যাওয়া এসব তথ্য জানান। তারাই বর্তমানে কালের সাক্ষী।

তারা বলেন, ঠাকুরদার কাছ থেকে তাঁরা এসব কথা শুনেছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর জমিদার বিশ্বেস্বর প্রসাদ বক্সী ও তার বংশধররা শ্রাদ্ধানুষ্ঠান উপলক্ষে সর্বশেষ এসেছিলেন নিজের বাড়িটাকে শেষ দেখা দেখতে। সেই শেষ। আর কেউ কখনও নাওডাঙ্গা জমিদার বাড়িতে আসেননি। বর্তমানে ভারত সীমান্ত ঘেঁষা কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলা সদর থেকে পশ্চিম উত্তরকোণে প্রায় ৮ কিলোমিটা দূরে ক্ষয়িষ্ণু অবয়ব নিয়ে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নাওডাঙ্গা জমিদার বাড়ি। জমিদার, জমিদারি শাসন, প্রজা, গোমস্তাবিহীন অযতœ অবহেলায় শুধু কঙ্কালসার ভবনটি এখনও অরক্ষিত অবস্থায় টিকে আছে।

বেহাত হয়ে গেছে এখানকার অনেক সম্পদ। ইট, চুন, সুড়কির নিপুণ গাঁথুনি এলাকার অসাধু ব্যক্তিরা ভেঙ্গে নিয়ে গেছে। পশ্চিম পাশের একটা দোতালা দালান তারা ভেঙ্গে ফেলেছে। অবশিষ্ট আছে শুধু সামনের মূল দালান ও ভেতরের একটা ছোট দালান। এলাকার অনেক অসাধু ব্যক্তি সেখান থেকে বিম ও অনেক ইট খুলে নিয়ে গেছে।

বর্তমানে এগুলোকে আশ্রয় করে বেড়ে উঠছে অপ্রয়োজনীয় কিছু উদ্ভিদ। জমিদার চলে যাওয়ার পর কিছু অসাধু ব্যক্তি লুটপাট করলেও বর্তমানে জমিদার বাড়িসহ অনেক জমি অবৈধ দখল করে আছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। তারা বাজার বসিয়েছেন জমিদার বাড়ির সামনে দোলের মেলার জন্য নির্ধারিত খোলা মাঠে।

সব মিলিয়ে জমিদার বাড়ির ঐতিহ্য এখন বিলুপ্তির পথে। সচেতন মহল কালের সাক্ষী এ জমিদার বাড়িটি দখলমুক্ত করে প্রতœতাত্ত্বিক বিভাগকে সংস্কার ও সংরক্ষণের দায়িত্ব নেওয়ার দাবি জানান। জমিদার বাড়িসহ এখানকার মন্দিরগুলো সংস্কার করলে অনেক লোক দূর-দূরান্ত থেকে নাওডাঙ্গার ঐতিহ্যবাহী জমিদার বাড়িটি একনজর দেখার জন্য ছুটে আসতেন।

এ বিষয়ে নাওডাঙ্গা জমিদার বাড়ির দুর্গা মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক সুশীল চন্দ্র রায় জমিদার বাড়ির সম্পদ উদ্ধার ও বছরের পর বছর ধরে বিলীনের পথে থাকা জমিদার বাড়িটি সংস্কারের জন্য সরকারের বিভিন্ন দফতরে গেছেন। কিন্তু লাভ হয়নি। তবে সরকার উদ্যোগ নিলে জমিদার বাড়ি সংস্কারসহ সব সম্পদ উদ্ধার করা সম্ভব। এলাকাবাসী সরকারের কাছে নাওডাঙ্গার ঐতিহ্যবাহী জমিদার বাড়িটি সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন।

উদ্যোগতারা জানান, পার্কের পাশাপাশি গড়ে তোলা হাচ্ছে মিনি পিকনিক স্পটও। পার্কটি খুব শিঘ্রই সবার জন্য বিনামুল্যে প্রবেশের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। এবং সেই অনুষ্ঠানে রংপুর বিভাগীয় কমিশনার মহাদয় উপস্থিত থাকবেন বলে সম্মতি দিয়েছেন।

খবরটি শেয়ার করুন..








© All rights reserved 2018 somoyersangbad24.com
Desing & Developed BY W3Space.net